সে আমার গোপন কথা

Monalisa-@-Blog
Share on facebook
Facebook
Share on twitter
Twitter
Share on whatsapp
WhatsApp
Share on email
Email

রান্নাঘরে বাসনের টুংটাং শব্দের পাশে, তেল হলুদের গন্ধ মেখে আমার যখন একটা একটা ক’রে দিন পার হয়, রান্নাঘরে চেয়ার টেনে উনি তখন চুপ ক’রে বসে থাকেন। …

 কানে হেডফোন দিয়ে স্টুডিওর ঘড়িটার দিকে যখন অপলক তাকিয়ে থেকে এক একটা সেকেন্ডের হিসেব কষি, এই বুঝি শুরু করতে হবে আকাশবাণীর অধিবেশন— ‘আকাশবাণী শান্তিনিকেতন, অনুষ্ঠান শুনছেন ১০৩.১ মেগাহার্জে…‍’  তখনও কনসোলের পাশে চেয়ার টেনে উনি চুপ ক’রে বসে থাকেন। …

যখন মনস্থির করেই ফেললাম আমার নিজের একটা শাড়ির বুটিক হবে, তখন যুতসই একটা বুটিকের নাম দরকার। নাম…নাম…কী নাম?

‘অরূপরতন’। এই নামকরণের সময়ও চেয়ার টেনে উনি চুপ ক’রে বসেছিলেন। …

একটা সময় তুমুল লড়াই করছি নিজের সঙ্গে। বেঁচে থাকব কিনা তাই নিয়েই সন্দিহান। রাতজাগা বালিশের পাশে চেয়ার টেনে উনি তখন চুপ ক’রে বসে থাকতেন। …

 ঝড় থামল, বৃষ্টিও। জীবনের। মনে হল এক পর্ব চুকলো। পর্বই বটে। ঝড়ে এলোমেলো গেরস্থালি যখন একটু একটু ক’রে গোছাচ্ছি তখনও উনি চেয়ার টেনে চুপ ক’রে আমার পাশে বসে থাকতেন। …

সেদিন শীতের সন্ধ্যায় আলো হাতে এক পথিক এলো আমার ভাঙা ঘরের দরজায়। পেছনে তার কুয়াশা ঢাকা অন্ধকার… হাতের আলোটুকুকে আমার সামনে তুলে ধ’রে গাইল সেই গান— ‘দিবস রজনী আমি যেন কার আশায় আশায় থাকি…’। প্রবল ভালোবাসার টানে ভাসব কিনা মনে তখন শত সহস্র দ্বন্দ্ব। ধরা দিলাম শেষমেশ। পাশে তখন চেয়ার টেনে উনি চুপ ক’রে বসে আছেন। …

মায়ের অসুখে দিশেহারা আমি যখন একটু ভরসা খুঁজছি, সংসারের ছোটোখাটো অশান্তিতে মন যখন খারাপ, বিনা অপরাধের বড়ো বোঝাটা যখন মাঝে মাঝে পিঠের ব্যথা বাড়িয়েছে, বাবার কাছে বসে যখন একটা দুটো সুখ দুঃখের গল্প বুনছি, মা-র শেখানো গানে-কবিতায় একটু একটু করে সুর-ছন্দকে ছুঁতে চাইছি, ভালোবাসার মানুষটি যখন গলা ছেড়ে গাইছে ‘তুমি আমারই… তুমি আমারই… মম জীবনমরণবিহারী’— আর চোখের ইশারায় খুঁজছে আমার প্রত্যুত্তর তখনও উনি চেয়ার টেনে চুপ ক’রে আমার পাশে বসে আছেন। …

আমি কী করব? উনি বসে থাকেন, আজও বসে থাকেন কিন্তু আমি ছুঁতে পারি না তাঁকে।

‘উনি’ কারোর কাছে কবি, কারোর কাছে জীবনদেবতা, কারোর কাছে নিছকই ‘রবিঠাকুর’। আর আমার? শুধুই ‘উনি’। তাঁর লেখা কত গান আজও শোনা হল না, কত গান বেসুরে গাওয়া হল না, সব লেখা পড়া হল না। কিছু গান শুধুই শোনা হল, কিছু লেখা শুধুই পড়া হল, অন্তরে নিলাম কই? তাঁর দেখানো পথে হাঁটলাম কই? তবে তাঁকে কাছে পাবার অধিকার কি আমার আছে? উপচে পড়া অডিটোরিয়ামে যখন মাইক্রোফোন হাতে নির্লজ্জের মতো কবিতা আউড়াতে আউড়াতে বলি—

‘আমারে না যেন করি প্রচার আমার আপন কাজে,/ তোমারি ইচ্ছা করো হে পূর্ণ আমার জীবন মাঝে’— তখনও উনি চেয়ার টেনে চুপ ক’রে আমার পাশে বসে থাকেন।…

প্রতিদিন সন্ধ্যারতি দেওয়া, ধূপ জ্বালানো, পুজো করা, ঠাকুর দেবতার ছবির সামনে বারবার প্রণাম করা, অমাবস্যা পূর্ণিমা তিথির খোঁজখবর রাখা— এর কোনোটাই আমার দৈনন্দিন জীবনযাপনে পড়ে না। তবু ঈশ্বরের পায়ে অবিচল থেকে যদি কিছু পাওয়ার প্রলোভন আমার সামনে আসে তবে হে ঈশ্বর আবার আমায় এমন জন্ম দিও যে জন্মে তাঁর সব লেখা, সব ভাবনা, সব দর্শনকে যেন আত্তীকরণ করতে পারি, অলঙ্কার ক’রে পরতে পারি। আমার ঘরে ক্যালেন্ডার নেই, আমার তাই আলাদা ২৫ বৈশাখও নেই। শুধু যে চেয়ারটায় চুপ ক’রে উনি আমার পাশে বসে থাকেন রোজ… সেই চেয়ারে আজ মাথা রেখে বলছি— ‘আমা হতে নাথ তোমাতে মোরে, নূতন জীবন দাও হে…’

Share on facebook
Facebook
Share on twitter
Twitter
Share on whatsapp
WhatsApp
Share on email
Email

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top