রচনা – রবীন্দ্রনাথ

Facebook
Twitter
WhatsApp
Email

রবীন্দ্রনাথ অনেক লম্বা ছিলেন আর রবীন্দ্রনাথের দাড়ি ছিল। সেটাও লম্বা। চুলটাও। এত লম্বা থাকার জন্য রবীন্দ্রনাথ কক্ষনো লুকোচুরি খেলতেন না। লুকোলেই তাঁকে সবাই খুঁজে ফেলত। তারপর পুলিশ বানিয়ে দিত। রবীন্দ্রনাথের পুলিশ হওয়ার কোনো ইচ্ছা ছিলনা। তবুও তিনি রোজ নিয়ম করে ডাইরি লিখতেন। রবীন্দ্রনাথের অনেকগুলো ডাইরি আছে। একটা ডাইরির নাম আমি জানি— গীতবিতান।

আমি টিভিতে অনেক সিনেমায় এই গীতবিতান দেখেছি। গীতবিতান ছুঁলে সবাইকে সত্যি কথা বলতে হয়। আর সত্যি কথা বললে খুব মারামারি হয় সিনেমায়। ঘুঁষি চলে। লাথি। তারপর গুলি চলে। হিরো এসে থামিয়ে দেয় এসব। লুঙ্গি ড্যান্স করে। আমার দাদা খুব ভালো লুঙ্গি ড্যান্স করতে পারে। নাচের ইস্কুলে শিখেছে।

প্রতিবছর দোলের দিনে আমার দাদা কলকাতা চলে যায়। আর দিদিভাই শান্তিনিকেতনে। ঐ দিন নাকি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরও দোল খেলতে আসেন। খুব লম্বা বলে রবীন্দ্রনাথের গালে আবির মাখানো যায়না। রবীন্দ্রনাথেরও আবির মাখার কোনো ইচ্ছা নেই। অনেক বয়স হয়েছে তো। তাই একইদিনে দুবার করে আবির খেললে দুবার চান করতে হবে। ঠাণ্ডা লেগে যেতে পারে তাতে। ঠাণ্ডা লাগলে ডাক্তার ডাকতে হয়।

আমার দিদির সঙ্গে যার বিয়ে হওয়ার কথা সেই লোকটা ডাক্তার। তবে সে রোগী দেখেনা। সে আমার মতো সিনেমাও দেখেনা টিভিতে। সে শুধু পড়ে। আর দিদিকে মাঝে মধ্যে গান শেখায়। ওরা দুজন মিলে যখন গান করে আমার খুব ভালো লাগে। আমি জেনেছি ঐ গানগুলোও রবীন্দ্রনাথের লেখা। রবীন্দ্রনাথ ডাইরি তে গানও লিখে রাখতেন মাঝে মাঝে। আমিও খাতার শেষ পাতায় ছবি আঁকি। একটা রবীন্দ্রনাথের গান আমি এখন খুব শুনছি। কিন্তু কিছুই বুঝতে পারছিনা। আমার দাদা দিদি আর ওই ডাক্তার লোকটাও শুনছে আর নিজেদের মধ্যে খুব তর্ক করছে। গানটা একটা পূর্ণিমা রাতে লেখা। ওরা বলেছে এই গানটা যে গাইছে তাকে পুলিশে দেওয়া উচিৎ। আমি সেই ভয়ে আমার খাতা থেকে সব শেষ পাতাগুলো ছিঁড়ে ফেলেছি। যদি ওরা দেখে নেয়? তাহলে নিশ্চয় বাড়িতেও পুলিশ ডেকে দেবে।

আমার খুব ভাবতে মনে হচ্ছে, রবীন্দ্রনাথ পুলিশ হলে কেমন হতো? কিন্তু একটাই অসুবিধে। রবীন্দ্রনাথ খুব শান্ত। ওরকম শান্ত পুলিশ মোটেই ভাল্লাগবেনা। আর অত্ত ডাইরি লিখলে সে চোর ধরবে কেমন করে? বরং রবীন্দ্রনাথ একজন লেখক হতে পারতেন। তাহলে আরও অনেক অনেক ডাইরি লিখতেন। আর আমি আবৃত্তির ইস্কুলে সেগুলো মুখস্থ করতাম। কিন্তু আমার আবৃত্তির আণ্টি খুব বাজে। আমি তালগাছ কবিতাটা মুখস্থ করতে পারিনি বলে আমাকে তালগাছের মতো একপায়ে দাঁড় করিয়ে দিয়েছিল। বৃষ্টি পড়ছিল সেসময় খুব বাইরে। আমি দেখছিলাম একটা শালিখ পাখি জানলার কার্নিশে এসে বসে আছে। আর খুব কিচির মিচির করছে। আমার শালিখ পাখি খুব ভালো লাগে। তবে দুটো দুটো শালিখ দেখতে হয় সবসময়। তাহলে দিন ভালো যায়।

আমি দিদির সঙ্গে শান্তিনিকেতনে গিয়ে কিছুদিন আগে আমি অনেক পাখি দেখে এসেছি। পাখিগুলো নিজেদের মধ্যে কথা বার্তা বলেনা তেমন। সব ইশারায় কাজ চলে। শান্তিনিকেতনে কথাবার্তা বেশি বলতে নেই বোধহয়। ঐ যেখানে একটা বড় অফিস আর তার উল্টো দিকে একটা বই এর বাড়ি আছে সেখানে তো এক্কেবারেই কথা বলতে নেই। তোমাকে এক পায়ে দাঁড় করিয়ে রাখলেও তুমি কিচ্ছু বলতে পারবেনা। কষ্ট পেলেও না। বললেই পুলিশের কাছে খবর চলে যাবে। আমি বাড়ি ফিরে এসব কথা দাদাকে বলে দিয়েছি। ঐ ডাক্তার লোকটাকেও বলেছি। ওরা আমাকে পাত্তা দেয়নি একেবারেই। বলেছে— এসব পাকা পাকা কথা তুমি কার কাছ থেকে শিখলে? এসব পাকা পাকা কথা তুমি একদম বলবেনা। যাও তালগাছ মুখস্থ করো গিয়ে ।

আমি তাই এখন আবার তালগাছ মুখস্থ করছি মন দিয়ে। কালকেও যদি মুখস্থ না বলতে পারি, তাহলে আবৃত্তির আণ্টি আমাকে আবার এক পায়ে দাঁড় করিয়ে দেবে। আমি বরং একপায়ে দাঁড়িয়েই সবকিছু মুখস্থ করব আজ থেকে। তবে মনটা খুব খারাপ। আমার দিদির সামনেই বিয়ে। ঐ ডাক্তার লোকটার সঙ্গে। দিদি চলে যাবে। বিদেশে চলে যাবে। ডাক্তার সেখানেও কিন্তু কোনো রোগী দেখবেনা। ডাক্তার সেখানে পড়াবে। অনেক বড় বড় লোককে পড়াতে হবে সেখানে। ডাক্তার যে কী পড়াবে কে জানে! ডাক্তারেরও অনেকগুলো ডাইরি আছে। কিন্তু সেসব ডাইরি আমাকে ছুঁতে দেওয়া মানা। আমি লুকিয়ে লুকিয়ে দেখেছি। একটা ডাইরির নাম মুখস্থ করতেও পেরেছি। সেটার নাম – রগোন জুসের রবীন্দ্রনাথ। কঠিন নাম!

ডাক্তার বলেছে— এখন না। আমি বড় হলে তবে ঐ ডাইরি টা পড়তে পারব। আর অনেক কিছু জানতে পারব। কিন্তু ডাক্তারের ঐ রবীন্দ্রনাথ জেনে আমি কী করব? আমিও কি ডাক্তার হয়ে যাব তাহলে? তবে আমার মন বলছে এরপর থেকে টিভিতে সিনেমা হলে ঐ ডাক্তারের ডাইরি ছুঁয়েই সব্বাইকে সত্যি কথা বলার শপথ নিতে হবে। রবীন্দ্রনাথের পুরনো ডাইরিটা আর কোনো কাজে লাগবেনা।

তাই বড় হলে আমি ডাক্তার হবনা। আমি আগে পুলিশ হবো। আমি খুব ভালো লুকোচুরি খেলতে পারি। তাই আমার খুব পুলিশ হওয়ার ইচ্ছে। আমার এখন মনে হচ্ছে রবীন্দ্রনাথও পুলিশ হলেই ভালো করতেন। খামোকা আমাকে তালগাছ মুখস্থ করতে হতনা। দিদিকে গান শিখতে হতনা। দাদাকে দোলের দিন কলকাতা যেতে হতনা। ডাক্তারকে আর অত কঠিন একটা ডাইরিও লিখতে হতনা। শান্তিনিকেতনে পাখিরা কিচির মিচির করতে পারত ইচ্ছে হলেই। ধুস কী যে করলেন লম্বা লোকটা। আমার একটুও ভাল্লাগছেনা আর। ঘুম পাচ্ছে খুব।

শুধু খুব ঝড় বৃষ্টি হচ্ছে বলেই আমি এখনও জেগে আছি। ভয় লাগছে। বাড়ির পাশেই এত শালিখ পাখি, সবাই মরে যায়নি তো?

Facebook
Twitter
WhatsApp
Email